ভিক্ষা জীবন ছেড়ে কাজ ও বাসস্থান চান কুলিয়ারচরের হিজড়ারা

0
23

সর্বশেষ আপডেট নভেম্বর ১, ২০২১ | ইমরান

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ:

কেবল লৈঙ্গিক ভিন্নতার কারণে আমাদের অবহেলা ও বৈষম্যপূর্ণ আচরণের শিকার হয়ে যাঁদের রাস্তাঘাটে হাত পাততে হয়, আমরা তাঁদের হিজড়া বলে চিনি। এই করোনা মহামারির মধ্যে কেমন আছেন তাঁরা? কি ভাবে দিন কাটছে তাঁদের? আমাদের সাহায্যের টাকায় যাঁরা “দিন আনি দিন খাই” ভিত্তিতে জীবন চলে, করোনা মহামারী সময়ে কি ভাবে তাঁদের পেট চলছে?

হিজড়াদের ঐতিহ্য চাঁদা তোলা। নববিবাহিত দম্পতি অথবা সদ্যোজাত শিশুর বাড়িতে গিয়ে আশীর্বাদের সূত্রে তাঁরা অর্থ আদায় করা। এ ছাড়া তাঁরা বাজারে গিয়ে দোকান থেকে নগদ অর্থসাহায্য গ্রহণ করা। বাসে বাসে উঠে বিভিন্ন কৌশলে টাকা তোলা হিজড়াদের উপার্জনের এসব রাস্তাও বন্ধ হয়ে গেছে করোনা মহামারীর কারনে।

তাই চাঁদাবাজী ও ভিক্ষা জীবনের অবসান ঘটাতে সম্মানজনক কর্মসংস্থান ও সুন্দর ভাবে বাঁচতে একটু মাথা গুজার জন্য বাসস্থান চান কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরের হিজড়ারা।

সোমবার (১নভেম্বর) সকালে উপজেলার দ্বাড়িয়াকান্দি বাসস্ট্যান্ডে সরেজমিনে গিয়ে দেখা হয় পায়েল সরকার (২৮), শাহীনূর (২৫), মুক্তা (২৮), রহিমা (২৪), খাইরুল (১৮), সাদিয়া (২৪), ববিতা (৩৬) ও সাথী (২০) নামে ৮ জন হিজড়ার সাথে। তাঁরা কেমন আছেন জানতে চাইলে তাদের গুরু মা পায়েল সরকার উত্তর দেন, অনেক খারাপ পরিস্থিতিতে আছি। কোনো এনজিও বা কোনো সরকারি জায়গা থেকে সাহায্য-সহযোগিতা পাচ্ছিনা। কি করব, কেমনে বাঁচব, কিছুই বুঝতেছি না। তিনি আরো বলেন, আমরাও মানুষ। আমরাও অন্যদের মতো ভালোভাবে জীবনযাপন করতে চাই। ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য একটু মাথা গুজার ঠাঁই চাই, খাওয়া-পড়া ও কর্মসংস্থানের নিশ্চয়তা চাই। আমরা আর অমানবিক জীবন চাই না। এ উপজেলায় ১৬ জন হিজড়া ভাড়া বাসায় মানবেতর জীবনযাপন করতে হচ্ছে উল্লেখ করে পায়েল সরকার আরো বলেন, শুনে আসছি সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন জায়গায় হিজড়াদের আবাসনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ উপজেলায় এধরনের উদ্যোগ না নেওয়ায় তাঁদের মাথা গুজার ঠাঁইয়ের ব্যবস্থা হচ্ছেনা। তাদের মানবেতর জীবনযাপনের কথা তুলে ধরতে গিয়ে তিনি আরো বলেন, স্থানীয়ভাবে তাদের কর্মসংস্থানের কোনো সুযোগ নেই। ভিক্ষাবৃত্তি, উৎসব-বিভিন্ন অনুষ্ঠানে হানা দিয়ে নানা অঙ্গভঙ্গি করে, ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি করেই চালাতে হচ্ছে তাদের ক্ষুণ্নিবৃত্তি। কেউ তাদের ভালো চোখে দেখে না। ফলে প্রতিনিয়তই লাঞ্ছনা-গঞ্জনা সইতে হচ্ছে তাদের। তাদের মৌলিক অধিকার ভোগের সুযোগ সৃষ্টি করা গেলে তারাও সমাজের মূল স্রোতধারায় ফিরে আসতে পারবে।

শাহীনুর বলেন, হাতে একটি টাকাও নাই, আমরা তো দিন আনি দিন খাই। কামে না আসলে টাকা পামু কেমনে? অনেক কষ্টের মধ্যে দিনাতিপাত করছি। ১৬ জনে মিলে দ্বাড়িয়াকান্দি বাসস্ট্যান্ডে মাসে ৪ হাজার টাকা ভাড়া বাসায় গাধা-গাদি করে একসাথে থাকতে হচ্ছে। কোন রকম খাওয়া দাওয়া ও প্রয়োজনীয় জিনিস পত্রের খরচ মিটিয়ে ঘর ভাড়ার টাকা রোজগার করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এইভাবে চলতে থাকলে গলায় দড়ি দিতে হবে। এমনিতেই আমাদের জন্ম নেওয়া তো পাপ, এত দিন বেঁচে ছিলাম, এই বেশি।

সাথী নামে এক হিজড়া বলেন, করোনা মহামারী ক্রান্তিলগ্নে আমরা সরকারি বেসরকারি ভাবে কোন প্রকার সাহায্য সহযোগিতা পাইনি। গত ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে সরকারি ভাবে উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে আমাদের ডাক্তারী পরীক্ষা করে একটি করে পরিচয় পত্র দিয়ে বলেছিলেন আমাদের জন্য সরকার মাসিক ভাতার ব্যবস্থা করবেন। তারও ব্যবস্থা হয়নি।

তাঁদের সাথে আলাপ করে জানা যায়, তাঁদের মধ্যে বেশ কয়েকজন নিজেদের পরিবার থেকে পরিত্যাজ্য, পরিবারের সঙ্গে তাঁদের নেই কোন যোগাযোগ। আবার কয়েকজন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েও তাঁরা নিজ পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী। যে অর্থ দিয়ে তাঁরা মা-বাবার দেখাশোনা করেন, ভাইবোনের পড়ালেখার খরচ জোগান দিয়ে থাকেন। তাই করোনার এই ক্রান্তিকালে তাঁরা বা তাঁদের পরিবার কি ভাবে জীবন যাপন করছে তারও খোঁজ নেননি কেউ।

কুলিয়ারচর উপজেলা সমাজসেবা অধিদপ্তরের জরিপমতে কুলিয়ারচরে হিজড়ার সংখ্যা প্রায় ৪০জন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ সরকার, প্রথম হিজড়াদের রাষ্ট্রীয়ভাবে নারী-পুরুষভিন্ন পৃথক লিঙ্গ হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। স্বীকৃতি প্রদান করা আর হিজড়াদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার মধ্যে এবং বাস্তবায়নের মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে করোনা ক্রান্তিকালে হিজড়াদের জীবনযাপন নিয়ে এখন পর্যন্ত সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়নি, না হয়েছে তাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের জন্য সরকারের তরফ থেকে কোনো ধরনের সাহায্য। তাহলে প্রশ্ন হলো, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় হিজড়াদের জন্য কি করছে এমন প্রশ্ন অনেকের?

কেন সমাজকল্যাণ বা দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে হিজড়াদের তালিকা প্রণয়ন করে, এ উপজেলার হিজড়াদের প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়নি জানতে চাইলে উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দ্বায়িত্বে) মো. মাইনুর রহমান মনির বলেন, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী ৫০ বছরের উপরে হিজড়াদের মাঝে হিজড়া জনগোষ্ঠীর বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এর মধ্যে এ উপজেলায় প্রথমে মিলন মিয়া ও ইব্রাহিম মিয়া নামে দুইজনকে এ ভাতার আওতায় আনা হয়েছে। নতুন করে আরো চার জনের জন্য এ ভাতার বরাদ্দ আসলেও বাকীদের বয়স না হওয়ায় তাদের মাঝে এসব কার্ড বিতরণ করা যাচ্ছেনা।

উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার মোসা. খাদিজা আক্তার বলেন, উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদ কর্তৃক প্রদত্ত তালিকা অনুযায়ী হিজড়াদের মাঝে ত্রাণসামগ্রি বিতরণ করা হয়েছে। কে কে পেয়েছে আর কে কে পায়নি তা এই মুহুর্তে আমার জানা নেই।

 

 

পূর্ববর্তী সংবাদমুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টে ‘দুর্নীতি প্রতিরোধে করণীয়’ শীর্ষক প্রশিক্ষণ অনুষ্ঠিত
পরবর্তী সংবাদবাজিতপুরে র‌্যাবের অভিযানে অস্ত্রসহ একজন আটক

উত্তর দিন

আপনার মন্তব্য লিখুন!
এখানে আপনার নাম লিখুন